৩০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫, শনিবার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ , ৮:১৬ পূর্বাহ্ণ

বিচারপতিদের অপসারণঃ সংসদ বনাম জুডিসিয়াল কাউন্সিল

এ.এইচ. জুয়েল

বিডিএসনিউজ২৪.কম

প্রকাশিত : ১১:০১ এএম, ১২ জুলাই ২০১৭ বুধবার | আপডেট: ১১:১২ এএম, ১২ জুলাই ২০১৭ বুধবার

বিচারপতিদের অপসারণঃ সংসদ বনাম জুডিসিয়াল কাউন্সিল

বিচারপতিদের অপসারণঃ সংসদ বনাম জুডিসিয়াল কাউন্সিল

বাংলাদেশের সংবিধান সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে কম সময়ে প্রণীত সংবিধান। যেমন পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নে সময় লেগেছিল সাত বছর। দ্রুততম সময়ে সম্পাদিত যেকোনো কিছুর সীমাবদ্ধতা থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানের মর্যাদা নির্ধারণ করলে তা হবে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সংবিধানের একটি। ৭২-এর তথা বঙ্গবন্ধুর প্রণীত সংবিধানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছিল এবং বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা ন‍্যস্ত করা হয়েছিল সংসদের উপর। এ দুটি বিষয়ই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংবিধানের অন‍্যতম বৈশিষ্ট্য। ৭৫-এর পর সংবিধান নিয়ে অনেক ছেলেখেলা হয়েছিল। ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংবিধান কলঙ্কিত করা হয়। তাই দেশের সচেতন জনগণ সব সময় ৭২-এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে এসেছে। সম্প্রতি হাইকোর্ট কর্তৃক সংসদের মাধ্যমে বিচারপতি অপসারণ সংশ্লিষ্ট অধ‍্যাদেশ ৯৬ বাতিল ঘোষণায় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পৃথিবীর কোনো পদ্ধতিই সমালোচনা বা সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে নয়। এক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য ও সুবিধাজনক পদ্ধতি বেছে নেয়া হয়। সুতরাং বিচারপতি অপসারণের বিষয়টিও সেই আঙ্গিকে বিবেচনা করতে হবে।

পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান এক অধ‍্যাদেশের মাধ্যমে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা ন‍্যস্ত করেন সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের উপর। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নেই এমন প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ছিল রাষ্ট্রপতির হাতের পুতুল মাত্র। বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর ৭২ এর সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয় এবং ৯৬ অনুচ্ছেদে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা ন‍্যস্ত করা হয় সংসদের উপর। পঞ্চম সংশোধনীতে আইয়ুব খানের অনুকরণে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা দেয়া হয় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে। উল্লেখ্য তখন বিচার বিভাগ স্বাধীন ছিল না। ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীতে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়। "বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করবে" - এই মর্মে সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০১৪ এর ৫ নভেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়। ৫ মে ২০১৭ আদালত উক্ত সংশোধনী বাতিলের রায় দেন।

প্রশ্ন উঠতে পারে ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের বিরোধিতা কি অযাচিতভাবে করা হচ্ছে! এ প্রসঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রেক্ষাপট উল্লেখ করা প্রয়োজন। ২০০৭ সালে রাষ্ট্রপতির এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিচার বিভাগ পৃথককরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। সংবিধান প্রণয়নের অধিকার সংসদের, তাই আওয়ামী লীগ চাইলে এ নির্দেশ উপেক্ষা বা বাস্তবায়ন বিলম্বিত করতে পারতো। কিন্তু ৭২ এর সংবিধান পুনঃপ্রবর্তনের সদিচ্ছা থাকায় সরকার গঠনের পরই ১৯৯৯ সালে বিচার বিভাগ পৃথককরণ বিধিমালা বাস্তবায়ন করা হয়। ষোড়শ সংশোধনী ছিল ৭২ এর সংবিধান পুনঃপ্রবর্তনের ধারাবাহিকতা।

বিচারপতি বনাম সাংসদ ও কিছু সংবাদ শিরোনামঃ
গত কয়েক বছরে অনেক সাংসদদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে, দুদকে তলব করা হয়েছে। কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি:
১. সাংসদ হান্নানসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল।
২. তাপস পালের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশীট।
৩. এমপি সুবিদ আলীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা।
৪. সাংসদ শওকতের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র শিগগিরই।
৫. ঝালকাঠির সাংসদ হারুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন।
৬. এমপি মোসলেম উদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলা।
৭. গাইবান্ধার সাংসদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র।
৮. আদালতে আত্মসমর্পণ করলেন সাংসদ আমানুর।
৯. সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধে সমন জারি।
এছাড়া বদিসহ আ`লীগের অনেক সাংসদদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দৃষ্টান্ত দেয়া যাবে যা অন‍্য কোনো সরকারের আমলে ঘটেনি। তাদের মুক্তি, জামিন বা শাস্তির প্রশ্ন তুললে আদালত অবমাননা হবে বলে আশঙ্কা করি!

এবার বিচারপতি প্রসঙ্গ
১. বিচারপতি মানিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ
আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২৯টি অভিযোগ আনেন এবং সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান।
সূত্র: bit.ly/mahmudj
উল্লেখ্য, কোনো একজন ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে জুডিসিয়াল কাউন্সিল গঠন করা যায় না। বিচারপতির পদটি সাংবিধানিক বলে সংবিধান অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার কথা।
অনেক আইনবিদের মতে, ব‍্যক্তির অভিযোগে জুডিসিয়াল কাউন্সিল গঠন বিচার বিভাগের জন্য হুমকি স্বরূপ।

২. তারেককে খালাস দেয়া বিচারক মোতাহার হোসেন দেশত্যাগ করে মালয়েশিয়ায়।
মামলা দায়ের থেকে রায় পর্যন্ত পুরো বিচার প্রক্রিয়ায় অনুপস্থিত থেকে অর্থপাচার মামলায় তারেক রহমানকে খালাস দেন বিচারক মোতাহার হোসেন।
দুদকের কাছে অভিযোগ রয়েছে, মোতাহার হোসেন লন্ডনে একটি বাড়ি, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা না মেনে অর্থ পাচার, ঢাকায় দুটি ফ্লাট, নিজ জেলা পাবনায় জমি ক্রয়, বিভিন্ন ব্যাংকে তার নিজের ও পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের নামে বড় অংকের টাকা, ফ্লাট বাড়ি, জমিসহ অঢেল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন।
সূত্র: http://bit.ly/tareqj
৩. এক বিচারপতির অপর বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ।

সাংসদ বনাম বিচারকদের তুলনামূলক তথ্যগুলো উল্লেখের কারণ প্রথমত, একজন সাংসদের বিরুদ্ধে যত সহজে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া যায়, বিচারকদের ক্ষেত্রে তা করা যায় না। দ্বিতীয়ত, শ্রেণী স্বার্থ বলে একটি ধারণা প্রচলিত আছে যা ষোড়শ সংশোধনী বাতিলে ১১ জনের মধ্যে ৯ জনের একতা থেকে অনুধাবন করতে পারি। সাংসদদের মধ্যে এমন নেই তা নয়, যেমন: বেতন-ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব সংসদে তোলা হলে কোনো দলের সাংসদরা বিরোধিতা করে না। এছাড়া শ্রেণী স্বার্থ বিষয়টি সাংসদদের মধ্যে দেখা যায় না। কারো দায় কেউ নিতে চায় না কারণ তাদের জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয়।

অন‍্যান‍্য দেশে প্রচলিত বিচারপতিদের অপসারণ পদ্ধতিঃ

১. যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের আর্টিকেল টু অনুসারে বিচারপতিদের অপসারণের পূর্ণ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভকে। এছাড়া সিনেটও অপসারণের উদ‍্যোগ নিতে পারে। এমন কি কোনো অপরাধ না করলেও বিচারপতিকে অপসারণ করতে পারে জনপ্রতিনিধিরা।

২. ভারতের পার্লামেন্ট সংবিধানের ১২৪(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারপতিদের অপসারণ করতে পারে।
সংবাদ: ভারতের প্রধান বিচারপতি-সহ সুপ্রিম কোর্টের আট বিচারপতির কারাদণ্ড
সূত্র: http://bit.ly/indiaj

৩. যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্ট এ‍্যাক্ট ১৯৮১ অনুসারে হাউজ অব পার্লামেন্ট বিচারপতি অপসারণ করতে পারে।

৪. শ্রীলঙ্কার প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত। শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্টে অভিশংসনের উদ্যোগ।
সূত্র: http://bit.ly/srilankaj

৫. কমনওয়েলথ দেশগুলোতে কিভাবে বিচারপতি অপসারণ করা হয় তার একটি গ্রন্থ রয়েছে যেখানে ১০৫ নং পৃষ্ঠায় বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা সংসদের বলে উল্লেখ রয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না এ বইয়ে সদস্য দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম রয়েছে।
Compendium on Judicial Appt Tenure and Removal in the Commonwealth বইটির পিডিএফ ভার্সন:http://bit.ly/justicej

বিচারপতি পদটি সাংবিধানিক আর সংবিধান প্রণয়নের ক্ষমতা সংসদের। "বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে" - এটি যদি যুক্তি হয় তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে কেন বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতেই ন‍্যস্ত! সব চেয়ে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে যারা ৭২ এর সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে এসেছিল তারাই এখন বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা আইয়ুব খান প্রবর্তিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে রাখতে চাচ্ছে! বাংলাদেশের বিচার ব‍্যবস্থা সম্পূর্ণ স্বাধীন। অন‍্যদিকে সাংসদরা সংসদ, জনগণ, আদালত সবক্ষেত্রে দায়বদ্ধ। তলব করা মাত্র সাংসদ ও মন্ত্রীরা কি আদালতে হাজির হয়নি? আদালত কি স্বপ্রণোদিত হয়ে সরকারকে নির্দেশ দেয়নি? সংবিধান প্রণেতাদের দায়বদ্ধতা থাকলে সাংবিধানিক পদের অধিকারী বিচারপতিদের কি জবাবদিহি থাকবে না? জবাবদিহির জন্য সংসদের চেয়ে গ্রহণযোগ্য আর কি হতে পারে? সাংবিধানিক পদে থেকে সংসদকে উপেক্ষা করা শুধু অযৌক্তিক নয়, এটি সংবিধান লঙ্ঘন এবং বিশ্বের গণতান্ত্রিক ধারার বিপরীত মেরুকরণ।