৪ পৌষ ১৪২৪, সোমবার ১৮ ডিসেম্বর ২০১৭ , ৪:২৯ অপরাহ্ণ

লেখক-পাঠকে মুখরিত ঢাকা লিট ফেস্ট

বিডিএসনিউজ২৪.কম

প্রকাশিত : ০১:২৪ পিএম, ১৮ নভেম্বর ২০১৭ শনিবার

লেখক-পাঠকে মুখরিত ঢাকা লিট ফেস্ট

লেখক-পাঠকে মুখরিত ঢাকা লিট ফেস্ট

দেশি-বিদেশি লেখক-পাঠক, প্রকাশক ও শিল্পীদের আনাগোনায় মুখর এখন ঢাকা লিট ফেস্ট। বাংলা একাডেমির সবুজ চত্বর যেন পরিণত হয়েছে বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায়। গতকাল শুক্রবার গল্প, উপন্যাস, নাটক, চলচ্চিত্র, কবিতা তথা সাহিত্যের নানা ক্ষেত্র নিয়ে চলা সেশনের পাশাপাশি নাচ, গান এবং বাংলার ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলাও উপভোগ করেন দর্শনার্থীরা। অনেকেই মগ্ন ছিলেন বই কেনায়।

 

এদিকে ছুটির দিনের সকালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ভরে উঠেছিল শিশুদের আনাগোনায়। ঢাকা লিট ফেস্টের পরিচালক সাদাফ সায সিদ্দিকী বললেন, ‘বিশ্বসাহিত্যের প্রতি আগ্রহী প্রজন্মের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম সৃষ্টি করা গেছে। সাত বছর আগে যখন শুরু হয় তখন মনে সাহস ছিল। আমাদের উদ্দেশ্য নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কিন্তু এর ফলাফল এখন সবার চোখের সামনে।’

 

দিনভর চলে নানা সেশন :কীর্তনের সুর দিয়ে শুরু হয় লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিনের আসর। এরপর আব্দুল করিম সাহিত্য  বিশারদ মিলনায়তনে শুরু হয় স্কটিশ ইতিহাসবিদ ও সাহিত্যিক উইলিয়াম ডালরিম্পলের সেশন। ডালরিম্পল তার ভ্রমণ কাহিনী থেকে পড়ে শোনান ও আলোচনায় অংশ নেন। আলোচনার এক ফাঁকে জানালেন অচিরেই আসছে তার রচিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইতিহাস নিয়ে একটি বই। সেখানে থাকছে বাংলাদেশ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।

 

বিকেলে লনের মঞ্চে আরবীতে কবিতা পড়েন সিরিয়ার কবি অ্যাডোনিস। সে সময় লনে তিল ধারণের জায়গা ছিলো না। জেরুজালেম নিয়ে রচিত কাব্য গ্রন্থ ‘আল কুদস’ থেকে দুটি কবিতা পড়েন তিনি। তার মধ্যে একটি কবিতার নাম ছিলো ‘ভ্যানিস সাইন’। বুকার জয়ী নাইজেরিয়ান সাহিত্যিক বেন ওক্রির বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য ফ্যামিশড রোড’ নিয়ে একটি সেশন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে লেখক নিজে তার উপন্যাস থেকে পড়ে শোনান ও পাঠকদের প্রশ্নের জবাব দেন।

 

একটি সেশনে যুক্তরাজ্য প্রবাসী মার্কিন উপন্যাসিক লিওনেল শ্রিভার আলোচনা করতে বসেন কথাসাহিত্যিক কাজী আনিস আহমেদের সঙ্গে। শ্রিভারের আলোচিত উপন্যাস ‘উই নিড টু টক অ্যাবাউট কেভিন’। বিশ্বব্যাপী ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী কর্মকান্ডগুলো কীভাবে তার উপন্যাসে ঠাঁই করে নিয়েছে সেটিই ছিলো আলোচনার মূল উপজীব্য।

 

দুই বাংলার সম্পর্ক নিয়ে ‘সম্পর্কের এপার-ওপার’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন বিভাস রায় চৌধুরী, শামসুজ্জামান খান, শাহীন আখতার প্রমুখ। বক্তাদের কথায় উঠে আসে ভৌগলিক সীমারেখা কখনও-ই দুই বাংলার সম্পর্ককে ভাগ করতে পারবে না। শামসুর রাহমান মিলনায়তনে গবেষক গর্গ চট্টোপাধ্যায় ও কবি মৌসুমী ব্যানার্জি মেতে ওঠেন অক্ষর ও বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনায়। অন্য এক আলোচনায় বিজ্ঞানী বেলাল বাকী বলেন, বিজ্ঞান চর্চা ছাড়া এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

 

উত্সবে নারীদের বহুল আলোচিত হ্যাশট্যাগ ক্যাম্পেইন ‘মি টু’ নিয়েও ছিল একটি সেশন। ভারতীয় সাংবাদিক জ্যোতি মালহোত্রার সঞ্চালনায় এই সেশনে ছিলেন বাংলাদেশি চলচ্চিত্র নির্মাতা সামিয়া জামান। প্রথিতযশা শিক্ষক ও নাট্য নির্দেশক জামিল আহমেদ, অনন্যা কবির ও সুপ্রভা বসেছিলেন ‘ইনট্যানজিবল’ নিয়ে আলোচনা করতে। জামদানি, বাউল গান বা মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো ঐতিহ্যই ছিলো তাদের আলোচনার বিষয়।

 

রিফাত মুনিমের উপস্থাপনায় ‘টেম্পোরারি পিপল’ শীর্ষক  আলোচনায় অংশ নেন দীপক উন্নি কৃষ্ণান এবং আন্দ্রে নাফিস সাহেলি। আলোচকদের দুজনই অভিবাসন ও পরবাস জীবন নিয়ে আলোচনা করেন। কথাসাহিত্যিক পারভেজ হোসেনের সঞ্চালনায় বিশেষ সেশন ‘রূপকথা ও পুরানো কথা যখন নতুন করে ফিরে আসে’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন আনিসুল হক, মইনুল আহসান সাবের, ফরিদা হোসেন এবং জহরসেন মজুমদার। বক্তারা বলেন, যখন লেখকের পক্ষে সরাসরি বাস্তব ঘটনার বর্ণনা দেওয়া সম্ভব হয় না তখন রূপকথাই আশ্রয় হয়ে ওঠে।

 

উত্সব প্রাঙ্গণে এসেছিলেন নায়ক রিয়াজ এবং অভিনেত্রী ও হুমায়ূন পত্নী মেহের আফরোজ শাওন। তারা এসেছিলেন চলচ্চিত্রকার হুমায়ূনকে নিয়ে কথা বলতে। এ সেশনে আরো অংশ নেন চলচ্চিত্র পরিচালক মতিন রহমান ও চিত্রগ্রাহক মাহফুজুর রহমান খান। দিন শেষে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব কামাল চৌধুরীর কবিজীবন নিয়ে আলোচনা করেন কবি ও শিক্ষক শামিম রেজা।

 

গতকাল শিশুদের জন্যও ছিল বেশকিছু আয়োজন। কথাসাহিত্যিক আনিসুল হক শোনান সাত ভাই চম্পার গল্প। এর আগে সকালে কসমিক টেন্টে শুরু হয় নাজিয়া জাবিনের গল্প বলা। এরপর বটতলায় প্রদর্শিত হয় সুকুমার রয়ের নাটক। দুপুর ৩টায় ভারতীয় শিশুতোষ লেখক নন্দনা সেন তার বই ‘মাম্বি অ্যান্ড নট ইয়েট’  থেকে গল্প পড়ে শোনান শিশুদের।

 

‘হার স্টোরিজ’ ২১ দিগ্বিজয়ী নারীর গল্প: রোকেয়া সুলতানার ইলাস্ট্রেশনে ২১ দিগ্বিজয়ী নারীর গল্পগাঁথা নিয়েই রচিত হয়েছে ‘হার স্টোরিজ’। বিকেলে হওয়া এই সেশনে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সিউতি সবুরের উপস্থাপনায় বাংলাদেশের লড়াকু ও প্রতিষ্ঠিত নারীরা অংশ  নেন। ছিলেন সাউথ এশিয়ান গেমসে সোনা বিজয়ী মাবিয়া আক্তার, এভারেস্ট জয়ী নিশাত মজুমদার, স্কলাস্টিকার এমডি মাদিহা মোর্শেদ, প্রথম কমব্যাট পাইলট নাইমা হক ও তামান্না ই লুিফ। আলোচনায় বক্তারা নিজেদের অনুপ্রেরণার গল্প বলেন। পরে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন।

 

বাংলা শিখছি- বললেন ভারতের লেখক জেরি পিন্টো:উত্সবে যোগ দিয়েছেন ভারতের মুম্বাইয়ে বসবাসকারী লেখক জেরি পিন্টো। বাংলা সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ প্রকাশ করে এই লেখক বলেন, ‘আমি একটু একটু করে বাংলা শিখছি এবং বাংলা সাহিত্যকে জানতে অনুবাদের বই পড়ছি। আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জীবনানন্দ দাশের কবিতার ব্যাপারেও আগ্রহী।’ নিজের লেখকসত্তা নিয়ে বলতে গিয়ে জেরি পিন্টো বলেন, ‘একজন লেখককে অবশ্যই সমাজ সচেতন হতে হবে। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা ছাড়া ভালো লেখক হওয়া সম্ভব নয়।’

 

প্রসঙ্গত, জেরি পিন্টোর বহুল আলোচিত ও পুরস্কারপ্রাপ্ত বই ‘হেলেন: দ্য লাইফ এন্ড টাইমস অব এ বলিউড এইচ-বম্ব’। এই বইটিতে বলিউডের আলোচিত অভিনেত্রী ও সালমান খানের সত্ মা হেলেনের জীবনের নানা কাহিনী তুলে ধরেছেন লেখক।

 

অস্কার বিজয়ী টিলডার পূর্বপুরুষ ছিলেন ঢাকায়:গতকাল সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিলেন অস্কার বিজয়ী ইংল্যান্ডের অভিনেত্রী ক্যাথরিন মাটিল্ডা সুইন্টন। সংক্ষেপে সবাই চেনে টিলডা সুইন্টন নামে। আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ হলে চলা এই অধিবেশনে অভিনেত্রী টিলডা তার অভিনয় জীবনের চেয়ে লেখক জীবন নিয়েই বেশি কথা বলেন। দীর্ঘ ৩২ বছর লেখালেখি থেকে দূরে ছিলেন, তা নিয়েই আফসোস করছেন। কথা প্রসঙ্গে জানালেন তিনিই প্রথম সুইন্টন নন যিনি বাংলাদেশে এসেছেন। তার পূর্বপুরুষ আর্চবিল সুইন্টন ঢাকায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্যাপ্টেন ছিলেন। টিলডা ১৯৯৭ সালে হলিউডে কাজ শুরু করেন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ‘দ্য বিচ’ ও ‘কন্সটেন্টাইন’।

 

ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা: গতকাল লিট ফেস্টে আগত দর্শনার্থী ও শিশুদের একাডেমির নজরুল মঞ্চের সামনে অনুষ্ঠিত লাঠিখেলা বেশ উপভোগ করতে দেখা গেছে। ১৫-২০ জনের লাঠিয়ালের একটি দল মাথার ওপর ভনভন করে লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে এসে হাজির হন নজরুল মঞ্চের সামনে। নড়াইল থেকে আসা এই লাঠিয়াল বাহিনীর নাম ‘বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ লাঠিয়াল যুব সংঘ’। ১৫-২০ জনের দলে তরুণদের পাশাপাশি তরুণীরাও আছেন। বাজনার তালে তালে প্রায় পৌনে একঘণ্টা লাঠিখেলার বিভিন্ন ধরনের কসরত্ প্রদর্শন করে এ লাঠিয়াল বাহিনী।