৯ আশ্বিন ১৪২৫, সোমবার ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৪:০৮ অপরাহ্ণ

হাত ধরাধরি করে চলুক ‘উনিশ’ আর ‘একুশ’

হাসান মাহামুদ

বিডিএসনিউজ২৪.কম

প্রকাশিত : ০১:৩৩ এএম, ৩ জুলাই ২০১৭ সোমবার | আপডেট: ০১:৫৯ এএম, ৩ জুলাই ২০১৭ সোমবার

হাত ধরাধরি করে চলুক ‘উনিশ’ আর ‘একুশ’

হাত ধরাধরি করে চলুক ‘উনিশ’ আর ‘একুশ’

একই সঙ্গে গর্বের এবং দুঃখজনক তথ্য হচ্ছে, বাংলা ভাষার মর্যাদা আদায়ে মাত্র ষোল বছর বয়সে প্রাণ দিয়েছে এক কিশোরী। অথচ তিনি এই বাংলার মেয়ে ছিলেন না। গর্বের বিষয়টি হচ্ছে, বাংলা ভাষার জন্য অকাতরে নিজের জীবন উৎসর্গ করা এই কিশোরী ‘পৃথিবীর প্রথম মহিলা ভাষা শহীদ’। তার নাম কমলা ভট্টচার্য।

পশ্চিমবঙ্গের প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক রণজিত্ চৌধুরী ‘বিস্মৃত বলিদান’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘দুই অঞ্চলের ভাষা আন্দোলনে কিছু পার্থক্য আছে৷ প্রথমটিতে বাংলা ভাষা নিয়ে চেতনা বহুদিন ধরেই ছিল৷ সেই ইতিহাসে ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২ একটি মাইলফলক৷ সেটাই পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মধ্য দিয়ে৷ আমাদের এখানে সমস্যার সূত্রপাত বাংলা ভাষাভাষী মানুষের প্রতি একটি রাজ্যের বৈষম্যমূলক আচরণ দিয়ে৷ এই বঞ্চনারই প্রতিবাদের বিয়োগান্তক পরিণতি ১৯ মে ১৯৬১-তে যে দিন এক মহিলাসহ এগারো জন শহিদ হন৷ ... শিলচর স্টেশনে সে দিন পুলিশের গুলিতে নিহতদের মধ্যে ছিলেন ষোলো বছরের ছাত্রী কমলা ভট্টাচার্যও৷ কমলা বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রথম মহিলা শহিদ৷’

রণজিত্ চৌধুরী তার প্রবন্ধের নামকরণ ‘বিস্মৃত বলিদান’ কেন করলেন এ নিয়ে ২০১৩ সালে একবার কথা হয়েছিল উনার সাথে। কাজ করতাম দৈনিক মানবকণ্ঠে। কলকাতা বইমেলায় গিয়ে এই গুণীজনের সাথে আলাপের সৌভাগ্য হয়েছিল। প্রশ্নটি শুনে তার অভিব্যক্তি ছিল- ‘নিহতদের মধ্যে ছিলেন ষোলো বছরের এক ছাত্রী, কাঠমিস্ত্রি, চায়ের দোকানের কর্মী, রেল কর্মচারী। শিলচর স্টেশনে দুপুর আড়াইটে নাগাদ পুলিশ বিনা প্ররোচনায় সত্যাগ্রহীদের উপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে৷  এই ঘটনার পর সারা দেশে নিন্দার ঝড় বইতে থাকায় অসম সরকার গৌহাটি হাইকোর্টের তত্কালীন প্রধান বিচারপতি জি মেহরোত্রার নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে৷ কিন্তু দুঃখের কথা এই যে, কমিশন রিপোর্ট জমা দেওয়ার পঞ্চাশ বছর পরেও সেটি প্রকাশিত হয়নি৷ মৃতদের পরিবার কোনও ক্ষতিপূরণও পায়নি৷ এসব শহীদদের ঘটা করে স্মরণও করা হয় না। তাদের প্রাপ্য মূল্যায়নও হলো কই? বিস্মৃত বলিদান বললে কী, খুব ভুল বলা হবে ... ?’

এর পরের বছরগুলোতে এ বিষয়ে খুব বেশি কাজ করা হয়নি। তবে ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এ বিষয়ে খুব বেশি কর্মসূচি বা অগ্রগতিও চোখে পড়েনি। তাহলে আর কী-ই বা বলার থাকে। শুধু ২০১৬ সালে দেখেছি, ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘আসামের ভাষা শহীদ দিবস’ পালন করা হয়। এর আয়োজন করেছিল ‘ভাষা আন্দোলন স্মৃতিরক্ষা পরিষদ’ নামের একটি সংগঠন। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গবেষক এম আর মাহবুব এই সংগঠনটির সভাপতি। তার কয়েক মাস পরে ডিসেম্বরে শুনলাম- শহীদের মর্যাদা পাচ্ছেন আসামে বাংলা ভাষা আন্দোলনে নিহতরা। তখন হিন্দুস্তান টাইমস, ইন্ডিয়া টাইমস, বিবিসি বাংলা ও বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ করলো- ‘আসাম রাজ্যের বরাকে বাংলা ভাষা আন্দোলনে নিহতদের শহীদের মর্যাদা দিতে চলেছে ভারত সরকার। একই সঙ্গে সেখানকার শিলচর রেল স্টেশনের নামকরণ করা হচ্ছে ‘ভাষা শহীদ স্টেশন’। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তাদের সম্মতির কথা আসাম সরকারকে জানিয়েছে। এবার আসাম সরকারকে আনুষ্ঠানিক গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে স্টেশনটির নাম বদল করতে হবে।’

খুব সম্ভবত ভারত সরকার ৯ ডিসেম্বর এই ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু ছয় মাস অতিক্রম হয়ে গেল, আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশের সংবাদ শোনা যায়নি। খুব আগ্রহ নিয়েই এই গেজেটের খোঁজ আমি রেখেছি কিন্তু আসাম রাজ্য সরকারের কাছ থেকে সেই সুসংবাদ আসেনি। এটি আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতা হতে পারে কিংবা অন্য কোনো প্রশাসনিক জটিলতার কারণ হতে পারে। কিন্তু দিন শেষে প্রাপ্তি হলো- ওই ১১ জন বীর আজো বঞ্চিতের কাতারেই রয়ে গেলেন।

যতদূর জেনেছি বরাকের মানুষ ২০০৫ সালে প্রথম দাবি তুলেছিলেন যে, বাংলা ভাষার আন্দোলনের জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন, সেই শহীদদের মর্যাদা দেওয়ার জন্য স্টেশনটির নামকরণ হোক ‘ভাষা শহীদ স্টেশন’। শিলচরের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক মঞ্চ এই দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন করে আসছিল। রাজ্য স্তর থেকে শুরু করে একের পর এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর কাছেও তারা আবেদন জানায়। তার ফল পাওয়া যায় গতবছর। কিন্তু এখনো তা কার্যকর হয়নি।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ ছাড়াও বিভিন্ন ফ্রন্ট থেকে মানুষের যুদ্ধে অংশগ্রহণ ছিল। কেউ কূটনৈতিকভাবে অবদান রেখেছেন, কেউ গানে গানে, কেউ কলমের মাধ্যমে, কেউ ফুটবল পায়েও অবদান রেখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে ফুটবল খেলা হয়েছিল, এটি পৃথিবীর একমাত্র ঘটনা, যা বাংলাদেশের। এখানে একটি তথ্য উল্লেখ করা যেতে পারে, বিশ্বে একটিমাত্র ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’ রয়েছে, এটি আমাদের এই বাংলাদেশের। এই দলের নামে জাতীয় ভাবে গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। এটিও বিশ্বে একমাত্র ঘটনা এবং অর্জন।

দলটি ফুটবল খেলেছিল ভারতের সীমান্ত এলাকাগুলোতে। এর মধ্যে বেশি খেলা হয় ভারতের আসামে এবং নদীয়া জেলায়।  ২০১৫ সালে এই ফুটবল দলের পুরো ঘটনা সংগ্রহ করে ‘রণাঙ্গণে ফুটবল’ সম্পাদনা করেছিলাম। এই কাজে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছেন বর্তমান যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ড. শ্রী বীরেন শিকদার, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু এবং সহঅধিনায়ক প্রতাপ সংকর হাজরা। উনাদের সহযোগিতায় আসামের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহে আসামের তখনকার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যাওয়া হয়েছিল। তখন ওখানে ‘আসামের ভাষা শহীদ দিবস’ সর্ম্পকে জানতে চেয়েছিলাম। ওখানকার ক্রীড়া বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেছিলেন, ‘এ বিষয়ে আসলে আমাদের খুব বেশি চাওয়া নেই, তবে আমরা চাই উনিশ আর একুশ হাত ধরাধরি করে চলুক৷’

এই চাওয়াটা খুব বেশি চাওয়া নয় হয়তো। পক্ষে-বিপক্ষে মতামত থাকতে পারে। তবে উপলক্ষ্য যেখানে এক, আত্মত্যাগ যেখানে বাংলাকে ঘিরে, সেখানে উদযাপনে হাত ধরে চলতে সমস্যা থাকার কথা নয় নিশ্চয়ই।

বিষয়টি নিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে কথা বলেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক এবং ভাষা সৈনিক অধ্যাপক ডা. মীর্জা মাজহারুল ইসলাম স্যারদের সাথে। এছাড়া পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেওয়ার আগে ভাষা সৈনিক আবদুল মতিনের সাথে কয়েক দফাই কথা হয়েছিল এ বিষয়ে। আবদুল মতিনের জীবনী লেখার সুবাদে খুব বেশি আলাপের সুযোগ হয়েছিল আমার। উনাদের সবারই মন্তব্য ছিল এমন- আমাদের ভাষা আন্দোলন এখন পৃথিবীজুড়ে স্বীকৃত, সেখানে খণ্ড খণ্ড অর্জন বা বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইতিহাসগুলোকে এক সাথে করলে বরং আরো ভাল। 

২০১৪ সালে অধ্যাপক ড. জীনাত ইমতিয়াজ আলী যখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ছিলেন, তখন উনার সাথেও এ বিষয়ে কথা হয়েছিল। তখন মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট মাত্র শুরু করেছিল ‘নৃ-ভাষাবৈজ্ঞানিক সমীক্ষা’ শীর্ষক একটি গবেষণার কাজ। প্রসঙ্গটি ছিল এরকম- ক্ষুদ্র জাতিগুলোর ভাষা সংরক্ষণের পাশাপাশি আসামের এই বিষয়টি নিয়েও আমরা কোনো কাজ করতে পারি কী না? এক্ষেত্রে আসাম বা ভারত সরকারের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা করা যেতেই পারে বলে তিনি মন্তব্য করেছিলেন।

এতক্ষণ এতগুলো রেফারেন্স উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে- মোটামুটি গণ্যমান্য এবং পদস্থ ব্যক্তিরা এ বিষয়ে কখনোই দ্বিমত করেননি বরং সাধুবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু উদ্যোগের অভাবে এ বিষয়ে সুন্দর কোনো সমাধান আসেনি।

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, আসামের ভাষা শহীদদের অবদানকে সম্মান জানিয়ে আমাদের বাংলা ভাষার মর্যাদার সংগ্রামের ইতিহাসে সম্পৃক্ত করে নেওয়া। তাহলে আমাদের ভাষার ইতিহাস আরো সমৃদ্ধ হতে পারে, উচ্চতর আসনে অধিষ্ঠিত হতে পারে।

এবার মূল উপলক্ষ্যে ফিরে আসি। আজ থেকে ৫৬ বছর আগে এই দিনে (১৯৬১ সালের ১৯ মে) আসামের বাঙালি অধ্যুষিত বরাক উপত্যকার শিলচরে বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলন হয়েছিল। ‘রাষ্ট্রভাষা’র দাবিতে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন হয়েছিল ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। নয় বছর পর আসামে আন্দোলন হয়েছিল ‘রাজ্যভাষা’ হিসেবে বাংলাভাষাকে স্বীকৃতি দানের দাবিতে। সেই ভাষা আন্দোলনে আসামে শহীদ হয়েছেন ১১ জন। সেই ভাষা আন্দোলন আজ ৫৬ বছরে পা দিচ্ছে। সেদিনের সেই ভাষা আন্দোলনের ফসল তুলে নিয়েছে বরাক উপত্যকার বাঙালিরা। আসামের দ্বিতীয় রাজ্যভাষা হয়েছে ‘বাংলা’। আর বরাক উপত্যকার সরকারি ভাষাও হয়েছে ‘বাংলা’।

উত্তর-পূর্ব ভারতের বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা রাজ্য আসাম। আসামকে ভাগ করা হয়েছে দুটি উপত্যকায়। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা ও বরাক উপত্যকা। বরাক উপত্যকায় রয়েছে তিনটি জেলা কাছাড়, করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি। কাছাড় জেলার জেলা সদর শিলচর। এখানের ৯০ ভাগ মানুষই বাঙালি বা বাংলায় কথা বলেন। ১৯৫১ সালে আদমশুমারিতে দেখা যায়, বরাকে বাঙালিরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। আসাম রাজ্যের একটি অংশে বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, এটাই মেনে নিতে পারছিলেন না সেদিন অসমিয়া নেতারা। ফলে ভারত বিভাগের পর বাঙালিদের সঙ্গে অসমিয়াদের একটা ঠাণ্ডাযুদ্ধ লেগেই ছিল। আর এর জেরে সংখ্যালঘু অসমিয়ারা বাঙালিদের ওপর নানাভাবে অত্যাচার চালিয়ে যেত সরকারি মদদে। কারণ, রাজ্য সরকারকে তখন থেকেই নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলো অসমিয়ারাই। শুধু তাই নয়, যেসব খাস জমি বাঙালিরা যুগ যুগ ধরে আবাদ করে উর্বর করে তুলেছে, সেই সব জমিও সরকার বাঙালিদের কাছ থেকে জোর করে কেড়ে নিয়ে দিয়ে দেয় অসমিয়া, খাসি ও গারোদের। ফলে এই নিয়ে বাঙালি-অসমিয়া বিরোধ শুরু হয়। বাঙালিদের মধ্যে বাড়তে থাকে ক্ষোভ ।

১৯৬০ সালের ২৮ অক্টোবর। আসাম রাজ্য বিধানসভায় পাস হওয়া আইনে বলা হয়, আসামের সরকারি ভাষা হবে অসমিয়া। বাঙালিসহ সবাইকে পড়তে হবে অসমিয়া ভাষায়। এই ঘোষণাকে সেদিন মেনে নিতে পারেননি বরাকের বাঙালিরা। তারা গর্জে ওঠেন এর প্রতিবাদে। বেরিয়ে পড়েন রাজপথে। ১৯৬১ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষা আন্দোলনের জন্য গঠিত হয় সংগ্রাম পরিষদ। সভাপতি হন আবদুর রহমান চৌধুরী আর সাধারণ সম্পাদক হন পরিতোষ পাল চৌধুরী। এই সংগ্রাম পরিষদকে ঘিরে বরাক উপত্যকার হিন্দু-মুসলমান এক হয়ে যায় ভাষার প্রশ্নে। শুরু করে আন্দোলন। দাবি ওঠে, ‘জান দেব তবু ভাষা দেব না। চাই বাংলা ভাষার স্বীকৃতি, রাজ্যস্তরে সরকারি ভাষা হিসেবে।’ শুরু হয় বরাকজুড়ে বাংলা ভাষার আন্দোলন।

১৯৬১ সালের ১৯ মে। সব বাধা ভেঙে আসামে শুরু হয় বাংলা ভাষার দাবিতে সত্যাগ্রহ আন্দোলন। সেদিন আন্দোলনে শরিক হতে শিলচর স্টেশনে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়। চলছিল অবস্থান ধর্মঘট। মানুষের মুখে মুখে বাংলা ভাষার স্বীকৃতির দাবিতে নানা স্লোগান। বিকেল চারটার মধ্যে এই সত্যাগ্রহ আন্দোলন শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বেলা ২টা ৩৫ মিনিটে শিলচর স্টেশনে ভারতের আধাসামরিক বাহিনী অতর্কিতে গুলি শুরু করে নিরীহ আন্দোলনকারীদের ওপর। এতে এখানে শহীদ হন আন্দোলনে যোগ দেওয়া ১১ তরুণ-তরুণী। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ষোল বছরের ছাত্রী কমলা ভট্টাচার্য (বাংলা ভাষা আন্দোলনের প্রথম মহিলা শহীদ), উনিশ বছরের ছাত্র শচীন্দ্র পাল, কাঠমিস্ত্রি চণ্ডীচরণ ও বীরেন্দ্র সূত্রধর, চায়ের দোকানের কর্মী কুমুদ দাস, বেসরকারি সংস্থার কর্মী সত্যেন্দ্র দেব, ব্যবসায়ী সুকোমল পুরকায়স্থ, সুনীল সরকার ও তরণী দেবনাথ, রেল কর্মচারী কানাইলাল নিয়োগী এবং আত্মীয় বাড়ি বেড়াতে আসা হিতেশ বিশ্বাস৷

এখানে একটি তথ্য জানিয়ে রাখা যেতে পারে, পৃথিবীর ইতিহাসে দুজন নারী মাতৃভাষার জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছেন- একজন শহীদ কমলা ভট্টাচার্য। দ্বিতীয় জন শহীদ সুদেষ্ণা সিংহ যিনি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষার স্বীকৃতির আন্দোলনে শহীদ হন।

বরাকের ওই ঘটনার খবর ২০ মে ভারতের বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশ হলে দেশজুড়ে ওঠে প্রতিবাদের ঝড়। দাবি ওঠে হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির। ৪০ হাজার মানুষের শোকমিছিল অনুষ্ঠিত হয় শিলচরে। ১১ শহীদের শেষকৃত্য হয় শিলচর শ্মশানে। আজও সেই শ্মশানে এই ১১ শহীদের ১১টি স্মৃতিস্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি স্মৃতিস্তম্ভের সামনে নামফলক রয়েছে শহীদদের। শিলচর স্টেশনের সামনে যেখানে হত্যা করা হয়েছে এই ১১ তরুণ-তরুণীকে, সেখানে তৈরি করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। ১১ শহীদের নামে ১১টি স্তম্ভ।

বাংলাভাষার সর্বজনগৃহীত কোনো ইতিহাস এখনো হয়তো রচিত হয়নি। কিন্তু সরকারিভাবে বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এই বিষয়টি কখনো স্বীকৃতি পায়নি। আমাদের সামগ্রিক ভাষার বিজয়ের ইতিহাসের সাথে বিষয়টি যোগ করা যেতে পারে। আসতে পারে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষা আন্দোলনের বিষয়টিও। এই আন্দোলনটিও হয়েছিল ১৯৫২ সালে আমাদের ভাষা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়ে।

আসামে বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দেয়া এই শহীদদের কথা বাংলাদেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বইতে লেখা নেই। পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসও নেই এই আন্দোলন সম্পর্কে। কিন্তু বাঙ্গালী ইতিহাস এবং বাংলার ইতিহাস এই শহীদদের কাছে ঋণী থাকবে সব সময়।

লেখক: সাংবাদিক।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)